ছবি আঁকার ক্লাস, নাকি ভালো ‘কপি করা’ শেখার ক্লাস?

ছবি আঁকার ক্লাস, নাকি ভালো ‘কপি করা’ শেখার ক্লাস?

শিশুদের ছবি আঁকা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। দলে দলে শিশুরা এসেছে। সাথে এসেছে তাদের অভিভাবকরা। বেশিরভাগ অভিভাবকরা উত্তেজিত, কারণ এখনও ছবির বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পরও আয়োজকরাও কিছু বলছেন না। তাদের সংক্ষিপ্ত উত্তর, সময় হলেই বিষয় দেয়া হবে।

সময় শুরুর ঘণ্টা পড়লো। প্রধান আয়োজক ঘোষণা দিলেন, ছবির কোন নির্দিষ্ট বিষয় নেই। শিশুরা যা খুশি তাই আঁকবে। সময় কেটে যাচ্ছে। আয়োজকরা কিছুক্ষণ পর চক্কর দিতে গিয়ে দেখেন অনেক শিশু এখনও বুঝে উঠতে পাড়ছে না তারা কি আঁকবে। এক জায়গায় পাশাপাশি ১০-১২ জন শিশু গ্রামের দৃশ্য আঁকছে। একজন আগ্রহ নিয়ে দাঁড়ালেন। খেয়াল করে দেখলেন প্রতিটি শিশুর গ্রামের দৃশ্য হুবুহু একই রকম। গাছের রঙ থেকে শুরু করে নদীর মধ্যে নৌকাটার পজিশনও একই। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো এরা সবাই একই ছবি আঁকার ক্লাসে যায়। আর সেজন্যই এমন সুন্দর কপি একটা আরেকটার।

ঘটনাটা সত্যি। আয়োজকদের একজন সেদিন অফিসে আফসোস করে আমাদের বলছিলেন, শিশুদের ছবি আঁকা শেখানোর নাম করে কিভাবে আমরা তাদের ক্রিয়েটিভিটিকে নষ্ট করছি। স্কুলের ড্রয়িং ক্লাস থেকে শুরু করে বাইরে ছবি আঁকার ক্লাসে আমরা তিল তিল করে শিশুদের সৃজনশীলতার বারোটা বাজাচ্ছি।

…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………

আমাদের একটি কোর্স আছে যেখানে শিশুরা নিজেদের মত করে একটি গল্প তৈরি করে এবং সেই গল্পের ইলাসট্রেসন বা ছবি তারা নিজেরাই আঁকে। গল্পের পাতায় পাতায় যে কথাগুলো থাকে সে অনুযায়ী নিজের মন থেকে কল্পনা করে ঘটনা অনুযায়ী ছবি আঁকতে হয়। সব শেষে শিশুর নিজের একটি গল্পের বই তৈরি হয়। সেটিকে আমরা আবার ই-বুক হিসাবে আমাদের ওয়েবসাইটে দিয়ে দেই যেন যেকোনো অভিভাবক চাইলেই বইটি ডাউনলোড করে নিজের শিশুকে পড়ে শুনাতে পারে।

শিশুদের লেখা গল্পগুলো চাইলে আপনারা ডাউনলোড করতে পারেন এই লিঙ্কে গিয়ে

এই কোর্সটি চালুর পর থেকেই আমরা এখন পর্যন্ত অনেক অভিভাবকদের ফোন পেয়েছি যে আমরা ছবি আঁকার কোন ক্লাস নেই কিনা। আমরা বলি, দেখুন, আপনি যেরকম ছবি আঁকার ক্লাস ভাবছেন বা জানেন সেই রকম ছবি আঁকার ক্লাস আমরা করাই না। তবে আমাদের গল্পের বই বানানোর এই কোর্সে ছবি আঁকার একটি বিষয় আছে যেখানে শিশুরা নিজেরা কল্পনা থেকে ছবি আঁকে। আমাদের যেহেতু শিশুদের সৃজনশীলতা বাড়ানো নিয়ে কাজ তাই প্রথাগত ছবি আঁকার ক্লাস আমরা করাই না।

কিডস টাইমে ভর্তির জন্য উপরের ছবিতে ক্লিক করুন

শিশুদের সৃজনশীলতা বাড়ানোর একটি উপায় হিসাবে ছবি আঁকা শেখানো চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। গত বছর দশেক ধরে আমাদের দেশেও এটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে কিন্ডারগার্ডেনগুলোর সুবাদে। সেখানে ছবি আঁকা একটি নিয়মিত ক্লাস এবং তার উপর পরীক্ষাও হয়। এবং সেই পরীক্ষায় ভালো না করতে পেরে অনেকে ক্লাসের পজিশনও হারায়। তাই ছবি আঁকা শেখানোর একটা কমার্শিয়াল দিকও খুব তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে গেছে। আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ছবি আঁকার স্কুল (অথবা কোচিং)।

আমার মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করে যেসব অভিভাবকরা ছবি আঁকার এই স্কুলগুলোতে শিশুদের পাঠাচ্ছেন তারা আসলে কি ভেবে পাঠাচ্ছেন। শিশুরা সুন্দর ছবি আঁকা শিখে বড় হয়ে আর্টিস্ট হবে এই আশা করেন না প্রায় কোন অভিভাবকই। স্কুলে ছবি আঁকার পরীক্ষায় ভালো মার্কস যেন আসে সেটি হয়তো কারোর কারোর মনে থাকতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ অভিভাবকরাই আমার ধারণা ছবি আঁকাকে একটা এক্সট্রা-কারিকুলার একটিভিটি হিসাবে দেখেন যেখানে শিশু কিছুটা সময় ব্যায় করতে পারবে এবং আনন্দ পাবে। সৃজনশীলতা বাড়ানোর জন্যও হয়তো কেউ কেউ পাঠান।

কিন্তু যেখানে ২০ জন শিশু একই আম, একই কলস অথবা একই গ্রামের দৃশ্য আঁকছে শিক্ষকের দেখাদেখি, যেখানে আমটা একটু বেঁকে গেলে অথবা রঙটা একটু ভিন্ন হলে শিক্ষক নিজে এসে ‘ঠিক’ করে দিচ্ছেন, সেখানে আর যাই হোক সৃজনশীলতার বিকাশ যে হচ্ছে না তাতে কোন সন্দেহ নেই। ছবি আঁকার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের মনের কল্পনাকে রঙের আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা। যেখানে শিশুর কল্পনার পাখির চেয়ে বাস্তবের মত হুবুহু পাখির ছবি আঁকা শেখানো বেশি গুরুত্ব পায় সেখানে শিশু নিজেও কতটা আনন্দ পায় সেটিও দেখার বিষয়।

বিখ্যাত আর্টিস্ট পিকাসো একবার আফসোস করে বলেছিলেন, প্রতিটি শিশুই জন্মগতভাবে একজন আর্টিস্ট। কিন্তু কঠিন বিষয় হল যখন বড় হয় তখন সেই আর্টিস্ট মনটাকে ধরে রাখা।

অভিভাবকদের কাছে অনুরোধ থাকবে শিশুকে ছবি আঁকার ক্লাসে দেয়ার আগে একটু খোঁজ নিন কারা ক্লাস নিচ্ছে, সেখানে কি হয়, কিভাবে তারা আসলে শিশুদের শেখায়। কেবল ক্লাস শেষে শিশুর ছবি আঁকার খাতায় সুন্দর ছবি দেখে খুশি না হয়ে শিশুকে জিজ্ঞেস করুন ছবিটি সে নিজে এঁকেছে নাকি তাকে কেউ সাহায্য করেছে। চারুকলার কোন ছাত্রছাত্রী ছবি আঁকা শেখাচ্ছে বলেই যে তারা শিশুদের ছবি আঁকা শেখানোর ব্যাপারে পারদর্শী তা নয়। ভালো আর্টিস্ট মানেই ভালো আর্ট শিক্ষক নয়। একজন ভালো আর্ট শিক্ষক জানেন কিভাবে শিশুদের কল্পনাশক্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়া যায় ছবি আঁকার মাধ্যমে। একজন ভালো আর্ট শিক্ষক সব শিশুকে কখনই একই জিনিস আঁকতে দেন না। একজন ভালো শিক্ষক শিশুদের আঁকার নিয়মগুলো শেখান, আঁকার বিষয়বস্তু নয়।

…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………

(লেখাটি লিখেছেন ওয়ালিউল্লাহ ভূঁইয়া, সিইও, লাইট অফ হোপ। তার অন্য লেখাগুলো পড়ার জন্য ভিজিট করুন তার মিডিয়াম অ্যাকাউন্টটি)

আগ্রহী অভিভাবকরা চাইলে আমাদের কোর্সগুলোতে রেজিস্ট্রেশন করে রাখতে পারেন আপনাদের শিশুর জন্য। নতুন কোর্স শুরু হওয়ার আগে আগে আপনাদেরকেই প্রাধান্য দেয়া হবে।

আমাদের কোর্সগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ওয়েবসাইট দেখুন। অথবা সরাসরি ক্লিক করুন এই লিঙ্কে।

লেখাটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন। আর নতুন কোন কোন বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে লেখা চান সেটি জানিয়ে আমাদের ফেসবুকে ইনবক্স করতে পারেন। আমাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের লিঙ্কটি পেয়ে যাবেন এখানে।

Share with friends
  •  
  •  
  •  
  •